Wednesday, 21 October 2009

আমি এখন কি করবো কিছুই বুঝছি না …

যেন টোকা দিলেই কিংবা ফুঁ দিলেই চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়বে এমন অবস্থায় দাঁড়িয়ে, দেয়ালে হেলান দিয়ে মোবাইলে কথা বলছিল মেয়েটি। পরণে নীল জিন্স আর কালো সোয়েটার। দেখেই বোঝা যাচ্ছে লন্ডনে নতুন এসেছে। মুখটা মলিন হয়ে আছে।

দৃশ্যটি আমি দেখি লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলে বাঙালি মালিকানাধীন একটি কলেজে। পরিচিত এক ছোটভাইয়ের এ্যাডমিশন সংক্রান্ত কাজে ওই কলেজে গিয়েছিলাম। লন্ডনে আমি দ্বিতীয়বার এরকম কোনো কলেজে গেলাম। ২ বছর আগে আরেকটি ভিসা কলেজে গিয়েছিলাম আরেকজনের সঙ্গে। তিনি ৪৫০ পাউন্ডের বিনিময়ে সারা বছরের উপস্থিতির হার ও পরীক্ষার রেজাল্ট ঠিকঠাক করে নিয়েছিলেন পরবর্তী ভিসা রিনিউয়ের জন্য।

হোয়াইটচ্যাপেলের ওই কলেজের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে আমার পরিচিত একজন আছেন। মেয়েটার কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানালেন মেয়েটাকে কলেজের এনরোলমেন্ট পেপার দেয়া হচ্ছে না। কারণ মেয়েটি বাংলাদেশে যে এজেন্টকে টাকা দিয়ে এসেছে সে এজেন্ট কলেজ কর্তৃপক্ষকে টাকাটা বুঝিয়ে দেয়নি। আমি আরো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে যা জানতে পারলাম তা হলো -

কলেজটির বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন মূল এজেন্ট রয়েছে। ধরা যাক এরকম একটি এজেন্টের নাম হলো 'ক'। এই এজেন্ট বাংলাদেশে থেকে লন্ডনের ওই কলেজের জন্য শিক্ষার্থী যোগাড় করে, টাকাপয়সা (পাউন্ডের সমপরিমাণ) নিয়ে কলেজে পাঠিয়ে অফার লেটার আনায়। এরপর শিক্ষার্থীরা ওই অফার লেটার নিয়ে ভিসার জন্য হাইকমিশনে ধর্ণা দেয়। কাজের পরিধি বাড়ানোর জন্য 'ক' এজেন্ট কিছু 'খ' 'গ' ‌‌‍'ঘ' সাবএজেন্ট নিয়োগ করে। ওই মেয়েটি এরকমই এক সাবএজেন্টের মাধ্যমে (ধরা যাক এজেন্ট 'গ') লন্ডনের ওই কলেজের অফার লেটার নিয়ে ভিসা পেয়ে লন্ডনে আসে। লন্ডনে এসে সে জানতে পারে তার এজেন্ট (মেয়েটি জানত না এজেন্টের মধ্যেই এতো বিভাজন) কলেজ কর্তৃপক্ষকে পুরো টাকা বুঝিয়ে দেয়নি।

এখন আমি আমার কলেজীয় পরিচিতকে জিজ্ঞাসা করলাম এক্ষেত্রে কলেজ কর্তৃপক্ষের করণীয় কি? তিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানালেন কিছুই করার নাই। ওই মেয়েটির বাকি ৬০০ পাউন্ড না পাওয়া পর্যন্ত (অথচ মেয়েটির মতে এজেন্ট যা চেয়েছে সে তাই দিয়েছে) কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে কোনো এনরোলমেন্ট পেপার দিতে পারবে না। এর মানে হলো মেয়েটি কোনো ব্যাংক একাউন্ট খুলতে পারবে না। NI নাম্বার পাবে না। আইডি কার্ড পাবে না। সর্বোপরি মেয়েটি স্টুডেন্ট ভিসায় এসেও ক্লাস করতে পারবে না।

কিন্তু এসব এজেন্ট-কলেজ কর্তৃপক্ষের মধ্যেও অনেক ভেজাল রয়ে গেছে। পুরো বিষয় জেনে আমার কাছে কয়েকটি প্রশ্ন জেগেছে। যেমন -

১। 'গ' হতে পারে সাব এজেন্ট। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে সে নিশ্চয়ই এজেন্ট 'ক' কে দিয়েছে। এজেন্ট 'ক' তো পুরো টাকা না পেয়ে কলেজ থেকে অফার লেটার আনতে চাইবে না। তাহলে 'ক' এজেন্ট ওই ৬০০ পাউন্ড মেরে দিয়েছে। এখন 'গ' এজেন্টের উপর দোষ চাপাচ্ছে। পুরো ব্যাপারটি দুপক্ষেরই সম্মতিতে ঘটছে?
২। ধরা যাক মেয়েটি আসলেই ৬০০ পাউন্ড কম দিয়েছে। এক্ষেত্রে এজেন্ট 'গ' বিষয়টি এজেন্ট 'ক' কে জানাবে। এজেন্ট 'ক' হয়তো সুযোগ করে দিতে পারে মেয়েটিকে লন্ডনে গিয়ে বাকি টাকা পরিশোধ করতে। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা হয়নি।
৩। কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে তারা বিষয়টির কিছুই করতে পারবে না। তাহলে প্রশ্ন আসে কোন আইন অনুযায়ী একজন এজেন্ট, সাব এজেন্ট নিয়োগ করতে পারে? যদিও করেও - দায়ভার তো মূল এজেন্ট এবং কলেজেরই থাকার কথা।

কলেজীয় পরিচিতজন বললেন মেয়েটি সাবএজেন্টের মাধ্যমে এসেছেন এবং তারা ওই সাবএজেন্টকে চিনেন না। মেয়েটিকে বলা হয়েছে ওই সাবএজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে মূল এজেন্টের কাছে ৬০০ পাউন্ড জমা দিতে। ওদিকে মেয়েটির ভাষ্যমতে ৬০০ পাউন্ড অর্থাৎ এজেন্টের চাহিদামাফিক পুরো টাকাই দেয়া হয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কলেজ কর্তৃপক্ষ কেন মূল এজেন্ট 'ক' কে চাপ দিচ্ছে না 'গ' এজেন্টকে টাকাটার হিসাব দিতে? কলেজীয় ভাইজান তখন নিরুত্তর থাকলেন।

এদিকে ছোটভাইয়ের কাজ শেষ হয়ে এসেছে। আমি আবার বারান্দায় বের হয়ে দেখি মেয়েটি তখনো ফোনে কথা বলছে। নতুন যারা আসছে তারা সবাই প্রি-পেইড মোবাইল সিম ব্যবহার করছে। এতোক্ষণ ধরে কথা বলতে গিয়ে মেয়েটির অনেক পাউন্ড খসে যাচ্ছে। মেয়েটির মুখ অন্ধকার। অপরপ্রান্তের কাউকে যেন বারবার করে অনুরোধ করছে, ভাইয়া আমি তো পুরো টাকাই দিয়ে এসেছি। এখন কি করব বুঝছি না। আরো ৬০০ পাউন্ড দিতে হলে তো আমি চলতে পারব না।

হায়! মেয়েটির কাছে হয়তো ১০০০ পাউন্ডই আছে। এ সমস্যার যদি কোনো সুরাহা না হয় তাহলে ৬০০ পাউন্ড দিয়ে দিলে আর থাকবে ৪০০ পাউন্ড। একমাসের খরচ, টেনেটুনে দুই মাস। তারপর ... ?

*** *** ***

এবার আসা যাক আমার পরিচিত ছোটভাইয়ের বিষয় নিয়ে। ট্যুরিজম এন্ড হোটেল ম্যানেজেমেন্টে পড়তে এসেছে দুই বছরের ডিপ্লোমায়। এ বিষয়ে ভর্তি হতে প্রথম বছরের কোর্স ফি হিসেবে তাকে বাংলাদেশ থেকে পরিশোধ করতে হয়েছে ৩৪০০ পাউন্ড। ভিসা মিলেছে পৌণে তিন বছরের। কলেজের প্রথম দিনে তাকে একটি ইংলিশ টেস্ট দিতে হয়। রেজাল্টে দেখা গেল তার ইংলিশ মোটামুটি ভালো এবং সে লেভেল-৪ (লেভেল-১ থেকে শুরু হয়েছে) ক্যাটাগরিতে পড়েছে। তারপরও ট্যুরিজম এন্ড হোটেল ম্যানেজমেন্টের মতো কড়া বিষয়ে পড়তে হলে আরো চোস্ত ইংরেজি জানতে হবে। এবং এজন্য তাকে জুন ২০১০ অর্থাৎ পরবর্তী ৯ মাসের জন্য ইংলিশ কোর্স করতে হচ্ছে। বাকি ৩ মাস ভ্যাকেশন। বাংলাদেশে পরিশোধ করা ওই ৩৪০০ পাউন্ড তার এসব ইংরেজি শিখতেই খরচ হয়ে যাবে। প্রথম বছর শেষ, টাকাও শেষ। চোস্ত ইংরেজি শেখার পর সে তার আকাঙ্খিত বিষয়ে পড়তে গেলে আবারও পরবর্তী বছরের ফি দিয়ে ভর্তি হতে হবে। অথচ তাকে নাকি এই ইংরেজি শেখার বিষয়ে বাংলাদেশের এজেন্ট কিছুই বলেনি। সে জানত লন্ডনে গিয়েই কলেজের প্রথম ক্লাসের দিন থেকে ট্যুরিজম এন্ড হোটেল ম্যানেজমেন্ট শিখতে শুরু করবে। কলেজীয় পরিচিতজন শ্রাগ করে জানালেন, এটাই নিয়ম। তবে তিনি আশার বাণী শোনালেন যে ইংরেজি শেখার পর পরবর্তী বছরের জন্য ভর্তি ফি কম রাখা হবে, এই যেমন ধরেন ২৪০০-২৬০০ পাউন্ড ...

এবার ইংলিশ শেখানোর বুজরুকিটা শোনেন। আমি একজনকে খুঁজে পেলাম যার ইংলিশ টেস্ট খারাপ হয়েছে এবং লেভেল-১ ক্যাটাগরিতে পড়েছে। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তারও কোর্স এন্ডিং ডেট হলো জুন ২০১০। অর্থাৎ আমার ছোটভাই লেভেল-৪ হয়েও একই সময় ধরে লেভেল-১ ক্যাটাগরির সঙ্গে একই সময় পর্যন্ত পড়াশোনা করে ইংলিশ চোস্ত করবেন। অথচ লেভেল-৪ এর যদি ৯ মাস লাগে তাহলে লেভেল-১ ক্যাটাগরির ছাত্রদের ইংলিশ চোস্তকরণে কমপক্ষে ১২ মাস লাগার কথা। একটু খোঁজখবর করে দেখা গেল লেভেল টেভেল সব ভুয়া। ইংলিশ শেখানোর কথা বলে সবার প্রথম বছরের কোর্স ফি মেরে দেয়া হচ্ছে। কলেজীয় পরিচিতজন আবারও জানালেন, এটাই নিয়ম। হোম অফিস থেকে লোকজন এসে নাকি খবরদারি করে যায়। ভালো কথা। কিন্তু বাংলাদেশী এজেন্টরা কেন এ বিষয়টা খোলাসা করেন না?

*** ***

কলেজ থেকে বের হওয়ার পরও বারবার ওই মেয়েটির মুখ মনে পড়ছে। 'ভাইয়া আমি এখন কি করব কিছুই বুঝছি না' বার বার কানে বাজছে। মেয়েটির এই আর্তি বুঝিয়ে দেয় মেয়েটি ওরকম কোনো স্বচ্ছল ফ্যামিলির নয়। এই অতিরিক্ত ৬০০ পাউন্ড তার জন্য বিশাল। হয়তো সে ঋণ করে এসেছে, নতুবা বাবার জমানো সবকটা টাকায় কিনেছে স্টুডেন্ট ভিসা। এখন ...?

লন্ডনের বাংলাদেশী মেয়েদের নিয়ে হঠাৎ করেই চালু হওয়া জোর গুজবে এ মেয়েটি নিশ্চয়ই সামিল হবে না এটাই কামনা করি।

*** ***

কি করা যেতে পারে এসব ক্ষেত্রে?

বাংলাদেশের এজেন্টদের কাছ থেকে ছাত্ররা কলেজ সম্পর্কে যেমনটা শুনে এসেছেন, লন্ডনে এসে তেমনটা যদি না মেলে তাহলে চাইলেই হোম অফিসের কাছে কমপ্লেন করা যেতে পারে। বিভিন্ন প্রমাণ সাপেক্ষে কলেজটির অনৈতিকতা যদি ধরা পড়ে তবে সেক্ষেত্রে হোম অফিস উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে কলেজের লাইসেন্স বাতিল সহ। এরইমধ্যে বাংলাদেশী মালিকানাধীন কয়েকটি কলেজ হোম অফিসের থ্রেটের মুখে ব্লাকলিস্টেড অবস্থায় রয়েছে। উপরের কলেজটিও এর বাইরে নয়।

কিন্তু শিক্ষার্থীরা অসহায় ...

কারণ হলো কলেজ যদি পছন্দ না হয় আপনি তা পরিবর্তন করতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে -
১। পুরোনো কলেজের (যেখানে ভর্তি হয়ে এসেছেন) ছাড়পত্র লাগবে
২। নতুন কলেজের (যেখানে ভর্তি হতে চাইছেন) মনোনয়ন লাগবে
৩। এবং নতুন কলেজের প্রথম বছরের কোর্স ফি সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে হবে যেখানে পুরোনো কলেজে পরিশোধকৃত টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না।

৩ নম্বর পয়েন্টে সবাই আটকে যাচ্ছে। এছাড়াও, কোথায় যাবেন? সবই তো ভিসা কলেজ। আর নতুন এসে সবকিছু বুঝে এরকম হ্যাপা কেউই সামলাতে চায় না। তাই নিরবে সবাই মেনে নিচ্ছে।

*** ***

আজ সকালে সদ্য আসা (৩ দিন হয়) ৩ জনকে সময় দিয়েছিলাম। বলেছিলাম ১০.৩০ মিনিটে আসতে। তারা এসেছে ১১.৪৫ মিনিটে। আজকেই প্রথম তারা লন্ডনের রাস্তায় বের হলো। এর মাঝে শুধু একদিন কলেজে গিয়েছিল। পথ হারিয়ে চিনে আসতে তাই এতো সময় লেগেছে। এয়ারপোর্ট থেকে তাদের রিসিভ করেছে যে ব্যক্তি, তিনি তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৬০ পাউন্ড করে নিয়েছে। কথা ছিল, বাসা ঠিক করে দেয়া থেকে কলেজে নিয়ে এনরোলমেন্ট করিয়ে, ব্যাংক একাউন্ট খুলে দিয়ে, NI নাম্বারের জন্য এপয়ন্টমেন্ট নিয়ে পারলে ছোটখাট জব খুঁজে দিবে। বাসাটাই শুধু ঠিক করে দিয়েছে, এরপরে লাপাত্তা।

তাদেরকে দোকানে নিয়ে বিরিয়াণী খাওয়ালাম। প্রথম না-না করছিল কিন্তু খেতে বসে বোঝা গেল এই বিরিয়াণীর কল্যাণে সন্ধ্যা, হতে পারে আগামীকাল সকাল পর্যন্ত তাদের চলে যাবে। তাদের সঙ্গে কথা বলে আমার আফসোস বাড়ল। এরা বাংলাদেশে কখনোই ইন্টারনেট ব্যবহার করেনি। কমপিউটার চালায়নি। বায়োডাটা কিংবা সিভি কিভাবে লিখতে হয় জানে না। এরা Elephant Castle উচ্চারণ করছে 'এলিফ্যান্ট ক্যাস্‌টল'। এদের মধ্যে একজন হিন্দু। Lamb বিরিয়ানী জানার পরও সে বলছে, ভাই আমি তো হিন্দু, গরু কিভাবে খাই?

*** ***

'আমি এখন কি করবো কিছুই বুঝছি না ...' শুধু ওই মেয়েটির হাহাকার নয়। অনেক ছেলেরও আর্তি এটা। বুঝে না বুঝে, যোগ্যতা কিংবা অযোগ্যতায় যারাই লন্ডনে এসেছে তাদের জন্য আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার নেই। পরিচিত সবাইকে জবের জন্য বলা রাখছি। কারো কাছ থেকে কোনো আশা নেই। রেস্টুরেন্টের মালিকরা সিলেটি। তাদের আত্মীয়রাও আসছে। রেস্টুরেন্টের জবগুলো তাই তাদের জন্য থেকে যাচ্ছে। এ সংকটে অনেকেই কোনোভাবে হয়তো টিকে যাবে। যারা পারবে না তাদের জন্য খারাপ লাগছে, তাদের ফ্যামিলির জন্য খারাপ লাগছে।

'আমি এখন কি করবো কিছুই বুঝছি না' ... এই হাহাকার আমারও ...

Monday, 19 October 2009

কথোপকথন ০১

- কি ব্যাপার আপনার মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল নাকি? পাচ্ছিলাম না ..
- হুম। আমি মোবাইল সাইলেন্ট করে রাখি।
- কেন? জরুরি কোনো ফোন হলে তো মিস করবেন।
- মোবাইল রিংটোন আমার ভালো লাগে না। বিরক্তি লাগে।
- কিন্তু আপনার প্রিয়জন যদি কখনো বিপদে পড়ে ফোন করে, তাহলে তো সাহায্য করতে পারবেন না। তখন?
- এরকম এখনো ঘটেনি।
- আচ্ছা আপনি মোবাইল ব্যবহার করেন কেন?
- ওমা আজকালকার দিনে কি মোবাইল ছাড়া চলা যায়?
- আপনাকে ফোন করে তো পাওয়া যায় না। মোবাইল ছাড়াই তো আপনার চলছে।
- তা কেন হবে? আপনি কি আমাকে মোবাইলে পান না?
- দুয়েকবার ছাড়া প্রায়ই পাই। কিন্তু অন্যেরা বলে আপনাকে সহজে পাওয়া যায় না মোবাইলে।
- হুম, সাইলেন্ট করে রাখি তো। পরে সেটা অফ করতে ভুলে যাই। তাছাড়া মোবাইল আরেক রুমে রেখে অন্য রুমে থাকলে, ফোন এলে বুঝি না।
- এর নাম তো 'মোবাইল', তাই না? ল্যান্ড ফোনের মতো করে ভাবলে কি হয়। মোবাইল হতে হবে চলমান, আপনে যেখানেই যাবেন মোবাইল সঙ্গে থাকতে হবে।
- তা ঠিক। কিন্তু আমি ভুলে যাই। মাঝে মাঝে টপআপ করতেও ভুলে যাই।
- তার মানে হলো মোবাইলের প্রয়োজনীয়তা আপনি অনুভব করেন না। এক কাজ করবেন? মোবাইল ছেড়ে দিন। আর ব্যবহার করবেন না।
- সেটা হবে না। অনেকেই আমাকে খুঁজে পাবে না। আমার অফিসেও সমস্যা হবে।
- তাহলে মোবাইল ফোনটাকে 'মোবাইল' হিসেবে চিন্তা করে সবসময় সাথে রাখুন। সাইলেন্ট করে রাখবেন না। সবসময় টপআপ করে রাখবেন। মনে রাখবেন বিপদে পড়ে কেউ ফোন করলে আপনার 'মোবাইল সাইলেন্ট' থাকার কারণে তাকে কোনো সাহায্য করতে পারবেন না। প্রবাদ আছে, দুধ দেয়া গরুর লাথি খাওয়ায় ভালো। মোবাইলের রিংটোনের কারণে আপনার বিরক্তি ঘটবে, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে। কিন্তু শান্ত থাকবেন ওটা ভেবে যে অনেক জরুরি কাজ, প্রিয়জন এদের কাছাকাছি থাকা যায় মোবাইলের কারণে। ঠিক আছে?
- না ঠিক নাই। আমি নিজেকে পরিবর্তন করতে পারব না। আমি অন্যরকম ...

Monday, 5 October 2009

লন্ডনের নতুন আসা শিক্ষার্থীরা ... (ভিডিও)

যারা ব্লগে, পত্রিকায় (ইংরেজি বিশেষ করে) বাংলাদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের দুর্দশা নিয়ে লিখছেন তাদের অনুরোধ করছি এসব বিষয় যেন কোনোভাবেই হোম অফিস কিংবা কোনো সরকারি কর্মকর্তাদের নজরে না আসে। কাগজকলমে শিক্ষার্থীরা 'অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল' এ অঙ্গীকার করেই এসেছেন। আমাদের সচেতনতা সৃষ্টির মূল কথাটি হলো - যদি ৬/৮ মাস নিজ খরচে চলতে পারেন তবেই শিক্ষার্থী হয়ে লন্ডনে আসুন।

শোনা যাচ্ছে এসব প্রতিবেদনকে আশ্রয় করে হোম অফিসের 'ফেও' ছাত্রদের পিছু লাগবে। কিছু অসৎ কলেজ (নানা দেশী) এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। রিসেশন কাটানোর প্রাথমিক ধাক্কা এসব স্টুডেন্টদের পয়সা দিয়ে সামলানো যাচ্ছে। কিন্তু অধিক শিক্ষার্থীর কারণে জনসংখ্যার হার লাঘব করতে 'ভিসা রিনিউ' রিফিউজ করা শুরু হয়েছে। আমার পরিচিত ২ জনের ভিসা রিফিউজ হয়েছে। মনে রাখবেন, এখন ভিসা পাওয়া যতো সহজ, ভিসা রিনিউ ততো কঠিন। যারা ১/২ বছরের ভিসা নিয়ে এসেছেন আগামী ২০১২ অলিম্পিকের আগে ভিসা রিফিউজের মাধ্যমে দেশে ব্যাক করানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখতে পারে হোম অফিস।

শুধু বাংলাদেশী নয় আফ্রিকান দেশ সহ উপমহাদেশের সকল দেশ থেকে প্রচুর শিক্ষার্থী এসেছে। তাই সবাইকে রাস্তায় সাবধানে চলতে ফিরতে অনুরোধ করছি। আফ্রিকান ছেলেপেলেরা গায়েগতরে শক্তিশালী, গভীর রাতে রাস্তায় আপনাকে হাইজ্যাক করে শেষ সম্বলটুকুও ছিনিয়ে নিতে পারে। এখন ফ্রডের পাল্লায় পড়তে পারেন, বিশেষত পাকি এবং তামিলদের থেকে সাবধান। কিছুদিন আগেও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এক বৃটিশ পাকি ১৯ জন বাংলাদেশীদের সোজা ইউকে বর্ডার এজেন্সীর ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে গেছে। এদের মধ্যে মাত্র ১ জন মুক্তি পেয়েছে।

যদি চাকরিও পানও তারপরও ২০ ঘন্টার বেশি কাজ করবেন না যেন। কর্মস্থলে 'রেইড' দেয়া চালু আছে। রাতের লন্ডন <:-P দেখার জন্য অযথাই সেন্ট্রাল লন্ডন ঘুরে বেড়াবেন না। বৃটিশ গভর্ণমেন্টের 'স্টপ এন্ড সার্চ' পলিসি আপনাকে খামোখাই হয়রানিতে ফেলবে। আপনার 'ওয়েস্টার কার্ড' ঠিকমতো মেইনটেইন করবেন। এ ওয়েস্টার কার্ডের লগ দেখে যাচাই করতে পারে আপনি কলেজে ঠিকমতো গিয়েছেন কিনা। ধরা যাক আপনার কলেজ হোয়াইটচ্যাপেলে, আপনি থাকেন লেইটোনস্টোন। সপ্তাহে তিনদিন আপনার ওয়েস্টারে হোয়াইটচ্যাপেল-লেইটোনস্টোন (ক্লাসের সময়সূচি মিলিয়ে) লগ যেন থাকে সেটা ঠিক রাখবেন।

আবারো বলছি - যদি ৬/৮ মাস নিজ খরচে চলতে পারেন তবেই শিক্ষার্থী হয়ে লন্ডনে আসুন।

ভিডিওর লিংক ফেসবুকে দেয়া আছে। সবার অনুমতিতে চিত্রগ্রহণ করা হয়েছে বলে ভিডিওটি ব্লার করে দেয়া হলো না।

*** ***

Saturday, 3 October 2009

একটা সিনেমা বানাতে চাই - ০৩

নতুন, যাদের ফিল্মমেকিং সম্পর্কে আগ্রহ আছে তাদের জন্যই এ ধারাবাহিক পোস্ট। পুরোনো, যারা ইতিমধ্যেই ফিল্ম কিংবা ভিডিও মিডিয়ায় কাজ করছেন তাদের জন্য এ পোস্টে কিছুই নেই। তবে নতুনদের উদ্দেশ্যে যে কোনো পরামর্শ তারা দিতে পারেন।

একটা সিনেমা বানাতে চাই - ০১ ~~ একটা সিনেমা বানাতে চাই - ০২

*** *** ***

একটি ফিল্ম তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়। ধাপগুলো হচ্ছে -

১. প্রি-প্রডাকশন (পূর্ব প্রস্তুতি)
২. প্রডাকশন (নির্মাণ সময়)
৩. পোস্ট-প্রডাকশন (নির্মাণ পরবর্তী সময়)

আপনার একটি গল্প আছে এবং ফিল্ম বানানোর জন্য টাকাপয়সাও আছে। তাহলে এবার দেখা যাক কোন ধাপে কি কি কাজগুলো সম্পন্ন করবেন।

প্রি-প্রডাকশন
এ ধাপটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ পরিকল্পনা কিংবা সিদ্ধান্ত এ ধাপেই নিতে হয়। যার প্রি-প্রডাকশন যতো শক্তিশালী হয়, তার প্রডাকশন ততো ভালো হয় এবং তার ফলে পোস্ট প্রডাকশনে প্রচুর সময় বেঁচে যায়। এজন্য খেয়াল করবেন বড় বড় হিট কিংবা বিখ্যাত মুভিগুলোর প্রি-প্রডাকশনে সময় বেশি ব্যয় হয়। পত্রপত্রিকাতেও ফিল্মের প্রি-প্রডাকশনের খবরগুলোও বেশি ছাপা হয়। বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতে সত্যজিতের ১ বছর আগেই গাছ রোপণ, টাইটানিক নিয়ে গবেষণা, কারিনা কাপুর কিংবা হালের রাণী মুখার্জির সাইজ জিরো হওয়া, টিচার রেখে ক্যাটরিনার হিন্দি ভাষা শেখা - এসবই প্রি-প্রডাকশনের অন্তর্ভুক্ত। যাহোক, নিচের ক্রমগুলো দেখলেই বোঝা যাবে প্রি-প্রডাকশনের কাজ কি।

১. স্ক্রিপ্ট লেখা ও গবেষণা
২. কলাকুশলী নির্বাচন
৩. কলাকুশলীদের সঙ্গে মিটিং
৪. প্রডাকশন ক্রু নির্বাচন (বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে মূলত ক্যামেরাম্যান, এডিটর, এ্যানিমেটর)
৫. মিউজিক ডিরেক্টর নির্বাচন ও মিটিং
৬. লোকেশন পরিদর্শন ও নির্বাচন
৭. শুটিং শিডিউল
৮. স্ক্রিপ্ট কারেকশন
৯. কস্টিউম এন্ড প্রপস ম্যানেজমেন্ট
১০. ক্রুদের সঙ্গে মিটিং
১১. যাতায়াত, খাওয়া, থাকা ম্যানেজমেন্ট

মূলত এ কয়টা কাজ। তবে সেট নির্মাণ ছাড়াও পাত্রপাত্রীদের চরিত্রের প্রয়োজনে বিশেষ কোনো ট্রেনিং প্রি-প্রডাকশনের আওতায় পড়ে।

প্রডাকশন
প্রি-প্রডাকশনের প্ল্যান অনুযায়ী প্রতিদিন শুটিং কিংবা ফিল্মিং করে যাওয়াটাই প্রডাকশন ধাপের মূল কাজ। প্রি-প্রডাকশনে জড়ো হওয়া সকল নির্মাণশিল্পী, কলাকুশলী তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব এসময় পালন করে যান। প্রডাকশন টিমে যারা যারা কাজ করেন তাদের লিস্ট দেয়া হলো নিচে (বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে, স্টান্টম্যানদের বাদ দিয়ে)

১. পরিচালক
২. ক্যামেরাম্যান
৩. লাইট ক্রু
৪. প্রডাকশন ম্যানেজার
৫. মেকাপম্যান
৬. স্পেশাল ক্রু (ট্রলি, জিবআর্ম, ক্রেণ, রেইনমেশিন, ব্লোয়ারমেশিন ইত্যাদি)
৭. এস্টিট্যান্টস (পরিচালনা, চিত্রগ্রহণ, প্রডাকশন, মেকাপ ইত্যাদি)
৮. কলাকুশলী

প্রি প্রডাকশনের শুটিং শিডিউল অনুযায়ীই এসময় কাজ চলতে থাকে। পরিস্থিতি অনুযায়ী মাঝে মাঝে কিছু সিদ্ধান্ত বদল হতে পারে। প্রতিদিনের নির্ধারিত শুটিং শেষে ছোট একটা মিটিং হয়ে থাকে পরবর্তী দিনের শিডিউল নিয়ে।

পোস্ট প্রডাকশন
প্রি-প্রডাকশনের প্ল্যানিং অনুযায়ী প্রডাকশনের কাজ শেষ হওয়ার পর শুরু হয় পোস্ট প্রডাকশন। ধারণা করতে পারছেন এ সময়টার মূল কাজ 'সম্পাদনা'। প্রি-প্রডাকশন শক্তিশালী হলে, প্রডাকশনের সময় সকল কাজ সুষ্ঠুমতে সম্পন্ন হলে পোস্ট প্রডাকশন দারুণ গতিময় হয়। যাহোক পোস্ট প্রডাকশনের কাজগুলো হলো -

১. সম্পাদনা
২. প্যাচওয়ার্ক (রি-শুটিং ইত্যাদি)
৩. নেপথ্য কণ্ঠ কিংবা ডাবিং
৪. এনিমেশন (টাইটেল কিংবা স্পেশাল কোনো এফেক্টের জন্য)
৫. মিউজিক ডিরেক্টরের সঙ্গে মিটিং ও আবহ তৈরি
৬. কালার কারেকশন
৭. মাস্টার (সম্প্রচারের উপযোগী) তৈরি করা।

মোটামুটি এ হলো একটি ফিল্ম কিংবা নাটক নির্মাণের তিনটি ধাপ। বড় পর্দার (১৬ মিলি, ৩৫ মিলি, ৭০ মিলি) জন্য এ ধাপগুলোর কোনো কোনোটিতে কাজের ধরণ ও ক্রুদের পরিবর্তন হয়। তবে ডিজিটাল ফিল্মমেকিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সকল বিষয়গুলো মোটামুটি উল্লেখ করেছি (ভুল হলে মনে করিয়ে দিয়েন)। আবারও বলছি নির্মাণে প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি হলো প্রি-প্রডাকশন। সবচেয়ে জোর দেয়া হয় ওই ধাপটির উপরই। আগামী পর্বগুলোতে প্রত্যেকটি ধাপের কাজগুলো সম্পর্কে আলাদা আলাদ পোস্ট দেয়ার ইচ্ছা আছে।

আপাতত এটুকুই। আমারফিল্ম.কম এ আপনার ফিল্ম দেখার প্রত্যাশায় রইলাম।

Thursday, 1 October 2009

একটা সিনেমা বানাতে চাই - ০২

আজকে কোনো কথা নয়। চলুন ফিল্ম দেখি বরং। ব্লগার মাহমুদুল হাসান রুবেল ৩ মিনিটের দৈর্ঘ্যে আপত্তি জানিয়েছেন। কিন্তু ৩ মিনিট আসলেই অনেক লম্বা সময়। বাংলাদেশের বর্তমান গল্পভিত্তিক বিজ্ঞাপনগুলো দেখলেই তা বোঝা যায়। স্বল্পদৈর্ঘ্যের ফিল্ম বানানো অনেক চ্যালেঞ্জের বিষয়।

একটা সিনেমা বানাতে চাই - ০১

*** *** ***

নিচের ফিল্মটির নাম টোকাই। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান - রূপান্তর সিনেমা টিম। স্ক্রিপ্ট, চিত্রগ্রহণ, পরিচালনা - নাইমুল ইসলাম অপু, সম্পাদনা - ইশতিয়াক জিকো,



এবার একটি বিদেশী ফিল্ম দেখি। ফিল্মের নাম OFFICE. (ইউটিউবে আর কোনো ইনফো পেলাম না)



ছবি দুইটিরই দৈর্ঘ্য ৩ মিনিটের কম। কিন্তু দেখুন মনে হবে অনেকক্ষণ ধরেই দেখলেন।

যাই হোক এবার একটা টাস্ক দিই যারা আগ্রহী তাদের জন্য। ছবি দুটি প্রথম থেকে দেখুন। আর এ দুটি ছবিতে ক্লোজ শট, মিড শট এবং লং শট - মোট কতোবার ব্যবহার করা হয়েছে তা টুকে রাখুন

আপাতত এটুকুই। আমারফিল্ম.কম এ আপনার ফিল্ম দেখার প্রত্যাশায় রইলাম।