Friday 3 August 2007

কেন খুলেছ তোমার ওই জানালা ...


শখের বশে একসময় টিউশনি করতাম। অংকটা আমার বেশ ভালোই আসে। সেই অংক করাতে হবে ক্লাস ফাইভের আর ক্লাস এইটে পড়ুয়া দুইভাইবোনকে। আমরা সেসময় থাকতাম মতিঝিল কলোনিতে। আমার ছাত্রছাত্রীরাও একই বিল্ডিংয়ের কোণার একতলায় থাকত।

পড়ানোর সময় পেছনের দরজাটা খোলা থাকত। সেখান দিয়ে দেখা যেত মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের টিচার্স কোয়ার্টার (ছবিতে দেখুন)। বেশ কিছুদিন পর আমি খেয়াল করলাম টিচার্স কোয়ার্টারের তিনতলার জানালায় একটা মেয়ের ছায়া।

পরদিন বন্ধুদের ঘটনাটা জানিয়ে সবাই মিলে খোঁজ নিতে শুরু করলাম। খবরে মিলল, মেয়েটির নাম পপি। আইডিয়াল স্কুলের এ্যস্টিস্ট্যান্ট হেডুর একমাত্র মেয়ে। ছোটভাই আছে, নাম রাফি। দুজনেই আইডিয়াল স্কুলে পড়ে। তবে এদের কাউকে কখনো স্কুলের বাইরে দেখা যায়নি। টিচার্স কোয়ার্টারে থাকার কারণে ভেতরের পথ দিয়েই স্কুল আসা-যাওয়া করে তারা।

আমি বেশ খুশিই হলাম। আদর্শ ফ্যামিলি, বাবা স্কুলটিচার। অভিযান শুরু হলো। প্রতিদিনই জানালার নিচে বন্ধুদের নিয়ে দাঁড়ানো, দরজার ফাঁক দিয়ে চিঠি, কার্ড এগুলো পাঠানো তো চললই।

একদিন জানালার নিচে ছোট টং দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ মেয়েটি জানালায় এসেই একটা কাগজ মুঠো করে নিচে ফেলল। আমি দৌড়ে কাগজটা তুলে আনি। খুলে দেখি দুই পৃষ্ঠায় Rice রচনা লেখা। পুরো রচনাটা পড়ে ফেললাম। ভেবেছিলাম, মেয়েটি হয়তো খুলে বলতে লজ্জা পাচ্ছে। তাই হয়তো রচনাটির মাঝে কোথাও i কোথাও হয়তো love ‍কোথাও you লিখেছে। পরীক্ষার জন্য কখনোই Rice রচনা এতোবার পড়িনি যতোবার I love you খুঁজতে গিয়ে ওই রচনাটি পড়েছি। কিন্তু খুঁজে পেলাম না কিছুই।

এভাবেই দিন চলতে থাকে। ছাত্র পড়ানোর সময় পপি সবসময়ই জানালায় থাকত। কোনো কোনো রাতে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে আমি জানালার নিচে দাঁড়িয়ে থাকতাম। মেয়েটা একঝলক এসে হেসে চলে যেত। আমি মুচকি হেসে বাসায় ফিরতাম। বন্ধুদের আড্ডা ছোট টং দোকানের সামনে নিয়মিত হয়ে গেল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও যখন মেয়েটার দেখা পেতাম না, তখন বন্ধুরা রাফি (মেয়েটার ছোটভাই) বলে চিৎকার দিত। মেয়েটা তৎক্ষণাৎ জানালায় এসে হেসে আবার চলে যেত। আমরা খুশিতে বাংলাফাইভ ধরিয়ে ফেলতাম। বিলটা অবশ্য আমিই দিতাম।

মেয়েটার সঙ্গে কেমন যেন জমে গেল। একটা নির্দিষ্ট সময়ে দুজনের দেখা হতে লাগল। পপি জানালায় এসে দাঁড়াত, আমি টং দোকানের সামনে। কখনো আগে চলে এলে, রাফি বলে জোরে ডেকে উঠতাম, পপি জানালায় চলে আসত। আমি গুণগুণ করতাম, কেন খুলেছ তোমার ওই জানালা, কেন তাকিয়ে রয়েছ জানি নাতো ...

>এর অনেকদিন পর। আইডিয়াল স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎই দেখি পপি। আমি প্রথমে চিনতে পারিনি। অবাক হয়ে দেখি আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। বন্ধুরা বলে, এই তো চান্স, কিছু একটা কিনে এখনই গিফট কর। আমি তাকিয়ে দেখি পপি লাইব্রেরি দোকানটায় বান্ধবিসহ ঢুকেছে। আমিও চটজলদি ঢুকে পড়লাম। তখন বেশ সুগন্ধিসহ ডিজাইন করা কলম পাওয়া যেত। আমি দোকানদারকে বললাম সেরকম একটা কলম দিতে। কলম নিয়ে আমি কাগজে এঁকে দেখি কালি আসে না। আরেকটা বদলে নিয়ে দেখি এটাতেও কালি নেই। আমি বিরক্ত হয়ে ক্রমাগত কাগজে কলম ঘষছি, কোনোটাতেই কালি আসে না। বন্ধুরা তাড়া দেয়, তোর কালির কি দরকার। কলম হলেই তো হলো ...

আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। কালি ছাড়া কলম কেমনে গিফট দেয়! আমি কাগজে কলম ঘষতেই থাকি। ওদিকে পপি বেরিয়ে যায়। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। এই প্রথম দেখা হলো। কলম দেয়ার ছুতোয় নিশ্চয়ই আঙ্গুলগুলো ছুঁয়ে দেয়া যেতো। ধ্যাত ...

সোনালী রংয়ের ছোট ত্রিভুজাকৃতির একটা কানের দুল পড়ত পপি। স্কুলছুটির পর একই পোশাকের একদঙ্গল মেয়েদের কারোরই মুখের দিকে আমি আর তাকাই না। সবার কানে আমি সেই ত্রিভুজাকৃতির কানের দুল খুঁজি। মিলে গেলে চেহারার দিকে তাকাই। কিন্তু পপিকে আর পাই না। পকেটে হাত দিয়ে কলম (এবার কালিসহ) চেপে আবার টং দোকানে গিয়ে বসে থাকি।

জানালার পর্দাটা একটু নড়ে উঠে। আমি উঠে দাঁড়াই, এখনই পপি উঁকি দেবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে সম্পূর্ণ বয়স্ক একজন মহিলাকে জানালায় দেখা যায়। আমার দিকে চোখ পড়তেই ত্রাহি চিৎকার করে উঠে,ওই সুন্দুর গুন্ডা। তুই আমার পোলারে ডাকস কেন?

আমি হতভম্ব হয়ে যাই। আমাকে বলছে? উপরে তাকাতেই আবার মহিলাটি চিক্কুর দিয়া উঠে, প্রতিদিন আমার পোলাটারে ডাকে। পোলাটা ভয়ে খেলতে যায় না। ওই সুন্দুর গুন্ডা তোরে আমি পুলিশে দিমু।

আমি অপ্রস্তুত হয়ে সেখান হতে সরে আসি। ঘটনা কি বুঝতে পারি না। পরে বন্ধুদের কাছ থেকে জানি, প্রতিদিনই আমার বন্ধুরা দয়াপরবশ হইয়া কলোনিতে ঢোকার আগে ও পরে প্রতিবারই রাফি বলে ডাক দিত। পপি ডাক শুনে জানালায় এলে বন্ধুরা মাথানিচু করে চলে যেত। আমি শুনে তো অবাক। আমার অবর্তমানে বন্ধুরা চামে চামে মজা লইছে। বন্ধুত্বের নিকুচি করি।

এরপর গঙ্গা-বহ্মপুত্রে অনেক জল বয়ে যায়। পপি আমাকে বই গিফট করে ওর বান্ধবির মাধ্যমে। আমিও প্রত্যুত্তরে চারটি বই গিফট করি। রাত ২/৩টা পর্যন্ত জানালার নিচে দাঁড়িয়ে থাকি। আমাদের মাঝে আর কখনো দেখা বা কথা হয়নি। কিন্তু জানতাম একদিন তো হবেই।

একদিন কলোনিতে পুলিশী রেড পড়ল। আইডিয়াল স্কুলের মাথায় দুইটা লরি দাঁড়িয়ে আছে। অসংখ্য পুলিশ। বাজারের ব্যাগ হাতে আমার এক বন্ধু আমাকে ডেকে বাইরে আনে। লুঙ্গি পড়ে আমিও বের হয়ে আসি। হেঁটে স্কুলের গেটের সামনে আসি। কি মনে করতেই উপরে তাকিয়ে দেখি, পুরা ফ্যামিলি তিনতলায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে পপির দিকে তাকিয়ে থাকি। হঠাৎই কানে আসে, ওই কুত্তা। উপরে তাকাইয়া আছস কেন?

কিছু বুঝে উঠার আগেই আবার কানে আসে, কুত্তা কোথাকার। তোরে আমি পুলিশে দিমু। তুই খাড়া আমি আইতাছি।

এতোক্ষণে বোধগম্য হয় পপির বাবা আমাকে গালি দিচ্ছে। তারপর আমারও এক সেকেন্ড দেরি হয় না। তুবড়ি ছোটাতে থাকি আমি। আমার গালির তোড়ে পুরা বারান্দা খালি হয়ে যায়। আমি হাঁপ ছেড়ে তাকিয়ে দেখি দুই লরি ভর্তি পুলিশ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বন্ধুকে খুঁজতে গিয়ে দেখি সে নাই। আমি একটু ভয় পাই। কোনোমতে সেখান থেকে চলে আসি।

এরপর থেকে পপির সঙ্গে আর কোনোরূপ যোগাযোগ নাই। জানালার নিচে অনেক দাঁড়িয়েছি তারপরও দেখি মিলেনি। পপি এভাবেই হারিয়ে যায়। তবে একদিন তিনতলায় উঠে গাল মেঝেতে ঠেকিয়ে অনেক কষ্টে দরজার ফাঁক দিয়ে একজোড়া পায়ের পাতা দেখেছিলাম। ঠাহর করি ওইটা পপিই ছিল।

২০ ফেব্রুয়ারি রাত। একুশে ফেব্রুয়ারির জন্য রাস্তায় আল্পনা আঁকছিলাম বন্ধুরা মিলে। কাজ অর্ধেক শেষ করে সবাই মিলে সিগারেট খাচ্ছি, হঠাৎই মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চাপে। পপিদের বারান্দায় তাকাই। বন্ধুদের বলতেই তাদের উৎসাহ মিলে। আমি চটজলদি বানর হয়ে যাই।

তরতর করে গ্রিল, দেয়াল বেয়ে পপিদের বারান্দায় উঠে পড়ি। অন্ধকারে ইতিউতি তাকিয়ে কিছুই দেখি না। নেমে যাব, এমন সময় হঠাৎই বারান্দায় ঝুলে থাকা একটা কামিজের দিকে চোখ পড়ে। হাত বাড়াই ...

নেমে এসে বন্ধুদের দেখাতেই সবাই হেসে গড়িয়ে পড়ে। এখন এই জামাটাকে নিয়ে কি করা যায়? আমাদের এলাকায় মাঝে মাঝে পুরান জামাকাপড় কিনে নেয় এমন হকার আসে। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো এই জামাটা বিক্রি করে তা দিয়ে চা-নাশতা খাওয়া হবে। কেউ কেউ বুদ্ধি দিল এটাকে পার্সেল করে পপির বাপের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হোক। সঙ্গে চিরকটু থাকবে এরকম, চাইলে তোমার মেয়েকেও উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

বন্ধুদের নিরাশ করে আমি জামাটা শার্টের তলে কোমরে গামছার মতো করে বেঁধে ফেলি। আল্পনার বাকি কাজটুকু শেষ করে বাসায় ফিরেই সটান বিছানায়। জামাটায় নাক ডুবিয়ে লম্বা ঘ্রাণ নিয়ে বালিশের তলায় রাখি। গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই।

সকাল ১১টায় ছোটভাইয়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে। চোখ মেলেই জামাটার কথা মনে পড়ে। বালিশের নিচে হাত দিয়ে দেখি সেখানে নেই। কি ব্যাপার! ছোটভাইকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেছে।

আমি ছিলাম ভয়াবহ ঘুমে। সকালে আম্মা ছোটভাইকে জাগাতে এসে দেখে নীল রঙের শাদা বলপ্রিন্টের মেয়েদের একটা জামা আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। আম্মা নাকি চিৎকার করতে গিয়েও থেমে যায়। দ্রুত ছোটভাইকে জাগিয়ে জিজ্ঞেস করে। ছোটভাইয়ের মতে, জামাটি নাকি এমনভাবে আমাকে জড়িয়ে ছিল, যেন আমি সত্যিই কোনো মেয়েকে জড়িয়ে শুয়ে আছি। এমন ভাবার কারণ হলো আমি সবসময়ই কোলবালিশ নিয়ে ঘুমাই যেটা লম্বায় প্রায় আমার সমান। পপির জামা কোলবালিশ ও আমাকে জড়িয়ে একটা বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা তৈরি করে। সব ঘটনা শুনে আমি অবাক হই। ভাবতে থাকি, বালিশের তলা থেকে জামাটা বের হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল কিভাবে!

আম্মা তখন বাইরে ছিল। ছোটভাইকে জিজ্ঞেস করি, জামাটা কই? ছোটভাই বলে, আম্মা ফেলে দিয়েছে। আমার সন্দেহ হয়। পুরা ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজি। আমাদের বাসায় পুরোনো পেপার বিক্রি করা হয় ৫/৬ মাস পরপর। তো সেই জামাটা আমি পুরোনো পেপারের সবচেয়ে নিচে খুঁজে পাই। তাড়াতাড়ি বের করে আমার ওয়ারড্রোবে তালা মেরে রেখে দিই।

বি.দ্র. : লেখাটা অনেক বড় হয়ে গেল। শেষ করে দিই। তবে শেষ করার আগে আরেকটা জিনিস জানাতে চাই। ওই ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৯৬ সালে। আজ পর্যন্ত জামাটা আমার ওয়ারড্রোবেই রয়েছে। পপির সঙ্গে কোনো যোগাযোগই নেই। তবে একবার ঈদে ফোন করে বলেছিলাম যে আমিই তার জামাটা চুরি করেছি। সেটা আরেক ইতিহাস।

1 মন্তব্য:

মাজেদুল ইসলাম said...

হায় হায়...এ ঘটনা শুনে ভাবী রাগ করেন নাই?